• E-paper
  • English Version
  • শনিবার, ১৯ জানুয়ারী ২০১৯, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন



লুঙ্গি পরা অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্য, স্বীকার এসপির

  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৮
  • ৪৫ বার পঠিত
ঢাকার পোস্তগোলায় গত শুক্রবার পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের সময় অস্ত্র হাতে জাঙ্গিয়া পরিহিত ব্যক্তিটিও পুলিশ সদস্য। ছবি : সংগৃহীত
ঢাকার পোস্তগোলায় গত শুক্রবার পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের সময় অস্ত্র হাতে জাঙ্গিয়া পরিহিত ব্যক্তিটিও পুলিশ সদস্য। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুর টোল নিয়ে বিক্ষোভের সময় রাইফেলের গুলিতে শ্রমিক সোহেল নিহত হয়। গতকাল রবিবার মিটফোর্ড হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়। তাকে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ মিজান শফিউর রহমান। তবে ওই রাইফেলটি পুলিশের না অন্য কারোর ছিল, তা নিয়ে এখনো রহস্য রয়েছে। এ ঘটনায় সেতুর ইজারাদার খোরশেদ আলমসহ এজাহারভুক্ত ৩১ জন ও অজ্ঞাতপরিচয় আরো আন্তত পাঁচ শ জনকে আসামি করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়েছে। গত শনিবার গভীর রাতে মামলাটি দায়ের করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাইফেলটি পুলিশের ছিল কি না জানতে চাইলে এসপি শাহ মিজান শফিউর রহমান তা নাকচ করে দিয়ে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশ স্বাভাবিকভাবে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করেছে। সেদিন পুলিশের গুলিতে কেউ নিহত হয়নি।

এদিকে হাতে অস্ত্র আর লুঙ্গি পরা একজন পুলিশ সদস্যের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। বলা হচ্ছে, ঘটনার দিন পোস্তগোলায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় ছবিটি তোলা। এই ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি শাহ মিজান বলেন, ‘ছবিটি একজন পুলিশ সদস্যের। তাঁর নাম মো. এবাদত। তিনি কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশ কনস্টেবল। পোস্তগোলায় টোল বাড়ানোর প্রতিবাদে আন্দোলনের সময় শ্রমিকদের হামলায় তিনি আহত হয়ে বর্তমানে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।’ লুঙ্গি পরে অস্ত্র হাতে দৌড়াচ্ছেন—এমন ছবি সোশ্যাল নেটওয়ার্কে দেখা যাচ্ছে—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেতু টোলমুক্ত করার দাবিতে ট্রাকচালক-শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করছিল। এর মধ্যে সকালে দুজন পুলিশ কনস্টেবলকে ওই এলাকায় পেয়ে শ্রমিকরা একটি নির্জন জায়গায় ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করে। এরপর তাদের পোশাক খুলে নেয়। পরে আনসার সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে পাশেই তাদের ক্যাম্প অফিসে নেয়। ক্যাম্প থেকে লুঙ্গি নিয়ে পরেন কনস্টেবল এবাদত। এরপর অন্য পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদের আন্দোলন থামাতে এগিয়ে এলে এবাদতও তাদের সঙ্গে লুঙ্গি পরেই যোগ দেন। ওই ছবিই ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।

ফেসবুকের ছবিতে ওই কনস্টেবলকে গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, হাতে অস্ত্র এবং লুঙ্গি ও জাঙ্গিয়া পরা অবস্থায় দেখা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিটফোর্ড হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের এক চিকিৎসক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, নিহত ব্যক্তির ময়নাতদন্তকালে পেট বরাবর পিঠে একটি ছিদ্র পাওয়া গেছে। তবে এটি কোনো পিস্তলের বা শটগানের গুলি না। গুলিটা রাইফেলের ছিল বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে। তার পেট থেকে কোনো গুলি পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে ওই চিকিৎসক বলেন, সম্ভবত গুলিটা তার পেট থেকে বের হয়ে গেছে।

এদিকে ঘটনার তিন দিনেও সোহেলের মৃত্যুর বিষয়ে কোনো মামলা হয়নি। পরিবারের লোকজনও জানতে পারেনি কার গুলিতে সোহেল নিহত হয়। গতকাল বিকেলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মো. শাহজামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রমিক সোহেল রাইফেলের গুলিতে মারা গেছে এ বিষয়টিই আমাদের জানা নেই। তবে কিভাবে কার গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে তার তদন্ত চলছে।’ তিনি জানান, এজাহারভুক্ত ৩১ জনসহ অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ শ জনকে আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ওসি আরো বলেন, ‘নিহতের পরিবারের লোকজন লাশ দাফন করে এখনো ঢাকায় আসেনি। তারা থানায় এসে মামলা দিলে আমরা মামলা নিব, নচেত পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করা হবে।’ এদিকে গতকাল স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সোমবার কুলখানির পর ঢাকায় এসে মামলা করতে চায়।

পুলিশের মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই দিন অর্থাহৃ গত শুক্রবার সকালে শ্রমিকদের বিক্ষোভের সময় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া হয়। এ ছাড়া এজাহারে পুলিশের ওপর হামলা, মারপিট ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশরাফুল আলম তালুকদার। তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এ ব্যাপারে ইজারাদার মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি সেদিন শ্রমিক আন্দোলনের সময় আমার নিজ বাড়ি ধানমণ্ডিতে ছিলাম।’

সরেজমিন : এদিকে ঘটনার রেশ এখনো কাটেনি। গতকালও সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চরম আতঙ্ক রয়েছে। থানায় মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকা পুরুষশূন্য প্রায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আফজাল হোসেন নামে একজন মুরব্বি বলেন, ‘থানায় মামলা হওয়ার পর পুলিশের ভয়ে এলাকায় কেউ থাকতে ভয় পাচ্ছে।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ট্রাকচালক বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন ছিল ব্রিজকে টোলমুক্ত করে আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু পুলিশ আমাদের ওপর হামলা চালায়। এখন আমরা কেউ ঘরে থাকতে পারছি না। আমাদের পক্ষ থেকে মামলা দেওয়া হয়েছে—পুুুলিশ তা আমলে না নিয়ে এখন উল্টো আমাদের আসামি করে মামলা দিয়েছে।’

গতকাল সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় সোহেলের ভাড়া বাসায় গিয়ে তার ঘর তালাবদ্ধ দেখা যায়। গত শনিবার গিয়েও বাসাটি তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। শুক্রবার সকালে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহেল (৩০) নিহত ও অন্য ৯ জন আহত হয়।

Facebook Comments



নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..